উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে মন্ডল পরিবারের বর্ণাঢ্য ইতিহাস।
পুঠিয়া উপজেলা (তৎকালীন থানা) বিএনপির গোড়াপত্তন হয়েছিল মরহুম আলিমুদ্দিন মন্ডলের হাত ধরে, যিনি দলটির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর অনুজ আব্দুস সাত্তার মন্ডল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে প্রথম সারির একজন সংসদ সদস্য ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আরও একবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান।
এই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারের আরেক সুযোগ্য উত্তরসূরি হলেন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল। দলটির প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই তিনি বিএনপির রাজনীতির সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি সর্বদা দল ও সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। ১৯৯০ সালের উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের বিপুল ভোটে পরাজিত করে তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং দলের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও মজবুত করেন। পরবর্তীতে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ধানের শীষের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
দলের চরম দুঃসময়ে প্রতিটি আন্দোলন, সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব প্রদান করেছেন। সংকটের মুহূর্তে রাজপথে তাঁর এই ধারাবাহিক ও সক্রিয় উপস্থিতির কারণেই পুঠিয়া-দুর্গাপুরের তৃণমূল বিএনপি নেতাকর্মীদের কাছে তিনি একজন অত্যন্ত জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতা হয়ে উঠেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৬ রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া–দুর্গাপুর) আসন থেকে ৮০ হাজারেরও অধিক ভোটের বিশাল ব্যবধানে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল। এই বিপুল বিজয় উত্তরবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বোচ্চ ভোটের ব্যবধানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
মন্ডল পরিবারের এই রাজনৈতিক সংগ্রাম কেবল অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়েছে পরবর্তী প্রজন্মেও। তাঁর একমাত্র ছেলে ব্যারিস্টার আবু বকর সিদ্দিক রাজন বর্তমানে বিএনপির রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয়। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে বিচারপতি মানিকের এজলাসে প্রশ্ন তোলার তীব্র প্রতিবাদ করায় এবং আরও বেশ কিছু রাজনৈতিক মামলায় তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল।
সাম্প্রতিক জুলাইয়ের গণআন্দোলনেও এই পরিবারের সদস্যদের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডলের সন্তান, ভাতিজা-ভাতিজি থেকে শুরু করে নাতি-নাতনিরা পর্যন্ত—পরিবারের নানা প্রজন্মের সদস্যরা এই আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এদের মধ্যে অনেককেই কারাভোগ করতে হয়েছে।
এককথায়, মরহুম আলিমুদ্দিন মন্ডল থেকে শুরু করে আব্দুস সাত্তার মন্ডল, এরপর অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল ও তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের এই রাজনৈতিক যাত্রাপথ কেবল একটি নির্দিষ্ট পরিবারের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়। এটি মূলত পুঠিয়া-দুর্গাপুর অঞ্চলে বিএনপির দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং ঐতিহ্যেরই এক অনন্য ধারাবাহিকতা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে থাকা মন্ডল পরিবারের এই নেতৃত্ব ও সংগ্রামের ইতিহাস উত্তরবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সুদীর্ঘ ও স্বকীয় অধ্যায়েরই প্রমাণ বহন করে।
