তেলের বাজারে মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রভাব: কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিয়ে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা, উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধি এবং জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারে পৌঁছায়। চলতি সপ্তাহের পুরোটা জুড়েই তেলের দাম ১১০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তেলের চাহিদা হ্রাস পেতে পারে। ফলে তেলের বাজারে একদিকে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা, অন্যদিকে চাহিদা কমে যাওয়ার প্রবণতা—এমন দুই বিপরীতমুখী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এই নানামুখী অস্থিরতার মধ্যে তেলের দামের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে বিলম্ব হবে। বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলে দাম আরও বৃদ্ধির ঝুঁকি রয়েছে। তবে দাম খুব বেশি বাড়বে না বলেও ধারণা করছেন অনেক বাজার বিশ্লেষক।
সৌদি আরবে হামলা ও জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের বিস্তার ও তেল পরিবহনে ঝুঁকি বাড়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নতুন হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের কয়েকটি কূটনৈতিক মিশন থেকে কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
বুধবার সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের বেসামরিক বিমানবন্দরে হুথিদের হামলায় একজন নিহত ও আটজন আহত হন। একই দিনে একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হন। এসব ঘটনায় উপসাগরীয় অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
তেল পরিবহনেও ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্যমতে, গত দুই সপ্তাহে বাণিজ্যিক জাহাজে অন্তত ১৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। হরমুজ প্রণালির বাইরেও ওমান উপসাগর পর্যন্ত ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা হচ্ছে। এতে ওই অঞ্চল থেকে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ও পরিবহনের ধারাবাহিকতা নিয়ে বাজারে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমে যাওয়াও তেলের দাম বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। গত সপ্তাহে দেশটির মজুত ৩০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল কমে ৪১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে। ফলে গত মঙ্গলবার তেলের দাম পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১১ দশমিক ৭৫ ডলারে ওঠে।
কমতে পারে চাহিদা ও সরবরাহ আইইএ-এর অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর–ডিসেম্বর) বিশ্বে তেলের চাহিদা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দৈনিক ২৫ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। পুরো বছরে চাহিদা কমার পরিমাণ দাঁড়াতে পারে দৈনিক ২৬ লাখ ব্যারেলে।
সংস্থাটির মতে, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ সংকট, মূল্যবৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণেই এই অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। ২০২৭ সালে তেলের ব্যবহার সামান্য বাড়লেও তা ২০২৫ সালের তুলনায় বেশ কম থাকবে।
সেপ্টেম্বরে বিশ্বে তেলের সরবরাহ আগের মাসের তুলনায় বাড়লেও, ২০২৬ সালের সামগ্রিক বার্ষিক সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৫৮ লাখ ব্যারেল কমতে পারে। তাছাড়া সেপ্টেম্বরে বিশ্বে তেলের মজুত কমেছে এক কোটি ব্যারেল। উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত থাকলে সরবরাহ পুনরুদ্ধার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বাড়তি থাকলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়বে। এতে সরাসরি চাপ পড়বে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ওপর। বাংলাদেশে জ্বালানির দাম পুরোপুরি বাজারনির্ভর নয়, সরকার প্রতি মাসে এটি নির্ধারণ করে। তবে বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে এবং সেই বাড়তি খরচ বহনের সক্ষমতা কমে গেলে, সরকার স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বাড়াতে বাধ্য হতে পারে।
স্থানীয় বাজারে দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতের উৎপাদনসহ সার্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। এর ফলে পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, "জ্বালানির দাম বৃদ্ধির আঘাত অর্থনীতিতে পড়বেই। তবে এর চেয়ে বড় শঙ্কার কারণ হলো অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। ফলে বাংলাদেশ যে নিম্ন প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চক্রের মধ্যে পড়েছে, তা থেকে বের হতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে।" তিনি আরও জানান, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সরকারের নীতিগত অবস্থানও এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
