স্বৈরাচার ফেরার পথ তৈরি করা হবে শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
রাজনৈতিক বিরোধিতা যেন কোনোভাবেই স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসার সুযোগ তৈরি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, তবে বিরোধিতা হতে হবে যুক্তিনির্ভর ও গঠনমূলক। অন্যথায়, বিরোধিতার নামে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের আত্মত্যাগের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল হবে।
সোমবার রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ এবং সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা ওসমানী উদ্যানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গঠনমূলক বিরোধিতার ওপর গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে বিএনপি সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করা, যুক্তি তুলে ধরা এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা। সংসদে বিতর্ক ও আলোচনার মধ্য দিয়ে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল বৈশিষ্ট্য।
তিনি আরও বলেন, শুধু বিরোধিতা করার রাজনৈতিক প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। সরকার ও বিরোধী—উভয় পক্ষকেই জনগণের কল্যাণ, দেশের উন্নয়ন এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো পক্ষই এককভাবে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে—এমন ধারণা গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা, চিকিৎসাসেবা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার মতো মৌলিক বিষয়গুলোতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার ক্ষেত্র থাকা উচিত। সংবিধান সংশোধন ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারসহ বিভিন্ন বিষয়ে ভিন্নমত থাকলে তা সংসদে আলোচনা ও যুক্তিতর্কের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।
জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের পাশে থাকার আহ্বান
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার এবং আহত ব্যক্তিদের যথাযথ সম্মান জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও শহীদ পরিবার ও আহত আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবার এগিয়ে আসা উচিত।
তাঁর মতে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করার অর্থ শুধু সেই আন্দোলনের কথা স্মরণ করা নয়; বরং আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী ব্যক্তিদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রত্যাশার মধ্যে গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ, ভোটাধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। পাশাপাশি মানসম্মত শিক্ষা ও চিকিৎসা, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ সমাজ প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি জানান, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারের সদস্যদের সহায়তা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সরকার পর্যায়ক্রমে কাজ করছে।
উন্নয়নের পাশাপাশি প্রকৃতি সংরক্ষণের তাগিদ
ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের প্রয়োজন মেটাতে অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি হলেও উন্নয়নকাজে পরিবেশের ক্ষতি যতটা সম্ভব কমাতে হবে। বিদ্যমান গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করে পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক এলাকা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ গড়ে তোলা শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকেরও ভূমিকা রয়েছে। জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ ও ওসমানী উদ্যান রাষ্ট্রীয় সম্পদ হওয়ায় এগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন।
উদ্বোধন করা হলো জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ
অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করেন। এ সময় কয়েকজন শহীদের পরিবারের সদস্য তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনের পর তিনি স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। পরে আধুনিকায়িত ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখেন এবং উদ্যানসংলগ্ন গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি প্রায় ৯০ ফুট উঁচু এবং প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত। এতে ৮৩৪ জন শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। স্মৃতিস্তম্ভের সামনে রয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
এ ছাড়া স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের ও ভেতরের অংশে স্থাপিত রিলিফ ভাস্কর্যগুলোতে বাংলাদেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক আন্দোলন ও সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান উল্লেখযোগ্য।
নতুন রূপে ওসমানী উদ্যান
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানের আয়তন প্রায় ২৩ একর। আধুনিকায়ন প্রকল্পের আওতায় পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি নতুন জলাশয় তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণ, নতুন বৃক্ষরোপণ এবং সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
উদ্যানটিতে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিংয়ের ব্যবস্থা এবং জলাশয়ের ঘাট তৈরি করা হয়েছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
উদ্যানটির আধুনিকায়নের লক্ষ্য হলো নগরবাসীর জন্য সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বিনোদনবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। তবে এসব স্থাপনা ও সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথাও গুরুত্ব পেয়েছে অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যাঁরা
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালামের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক নেতা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এবং স্থানীয় সরকার সচিব শহীদুল আলমসহ অন্যরা।
বক্তারা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ, তাঁদের পরিবারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
